লেখাটি রইল ...
যে ছেলেটি বিকেল হলেই বন্ধুদের সাথে পাড়ার মাঠে দাপিয়ে ফুটবল খেলত, আজ সে পড়ে আছে হাজার মাইল দূরের কোনও এক বিলাসবহুল হোটেলের রান্নাঘরে। আজ সবাই জানে তার হাতে জাদু আছে, তার হাতের রান্নায় নাকি আত্মা তৃপ্তি পায়, ফরেনাররা তার রান্নার প্রশংসা করে, কেউ খোঁজ রাখে না, তার দু পায়েই জাদু ছিল। সারাদিন কাজের শেষে, ক্লান্ত শরীরে সে যখন বিছানায়, সে ফিরে যেতে চায়, তার পাড়ার ফুটবল মাঠে, তার ফেলে আসা বন্ধুদের সাথে আরও একবার চিৎকার করে বলতে চায়, দেখিস, আমরাই জিতব। কখন যে সে নিজের কাছেই হেরে বসে আছে, জানতেও পারে না। হাজার মাইল দূরের বিলাসবহুল শহরের নিঝুম রাতের তারারা জানতে পারে না, ছেলেটির মন ভালো নেই।
যে ছেলেটি ফুলের বাগান করতে ভালোবাসত, যার বাড়ি ভর্তি নানা রঙের ফুলের বাহার, আজ সে জীবনের সব রং হারিয়ে কাজ নিয়েছে বিদেশে। তার বাগানের ফুলেরা পরিচর্যার অভাবে মাথা নত করে মৃত্যুর দিন গোনে। অপেক্ষা করে থাকে ছেলেটির ফিরে আসার পথ চেয়ে। দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়, ছেলেটির চুক্তির মেয়াদ ফুরোয় না। কংক্রিটের অট্টালিকায় বসে ছেলেটি ফিরে পেতে চায়, তার সাজানো ফুলের বাগান, প্রজাপতির আনাগোনা। মসৃন, চকচকে দেয়ালেরা জানতে পারে না, ছেলেটির মন ভালো নেই।
পড়াশোনায় বরাবর ভালো ছেলেটি, এইচ.এস. পাশ করার সাথে সাথে সংসারের দায় কাঁধে নিয়ে পাড়ি দেয় বিদেশে। প্রতিদিন ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ, ডিনারের নিত্য নতুন খাবারের ছবি পোস্ট করে ফেসবুকে। আত্মীয় পরিজনেরা কমেন্ট করে, ভালোই আছিস বস। বন্ধুরা কমেন্ট করে, লাইফ ভাই তোরই, এনজয় করে নে। গভীর রাতে ছেলেটি বন্ধুদের প্রোফাইল দেখে, কেউ অনার্স করছে, কেউ বা ইঞ্জিনিয়ারিং। ছেলেটির বুক ভারী হয়ে আসে। ফেসবুকের হাজার বন্ধুর কেউ জানতে পারে না, ছেলেটির মন ভাল নেই।
যে ছেলেটি একটি দিনের জন্যও তার স্ত্রী সন্তান থেকে দূরে থাকেনি, আজ দু বছর হল, সে বিদেশে পড়ে আছে। শুধুমাত্র স্ত্রী সন্তানকে ভাল রাখার জন্য সে বুকে পাথর চাপা দিয়েছে। যে সন্তানকে সে প্রতিদিন বিকেলে সাইকেলে নিয়ে ঘুরে বেড়াত, আজ দু বছর হল, একটি বারের জন্য তাকে কোলে নিয়ে পারেনি। প্রতি রাতে ভিডিও কলে কথা হয় বাড়ির সবার সাথে, হাসি মুখে বলে ভাল আছি আমি, খুব ভাল আছি। সন্তানকে কোলে নেওয়ার চেষ্টায় মোবাইলকেই বুকে জড়িয়ে ধরে। স্মার্টফোন তার আলটিমেট স্মার্টনেস নিয়েও জানতে পারে না , ছেলেটির মন ভাল নেই।
বছর ১৮ এর ছেলেটি রোজ মাঠে ঘুড়ি ওড়াতে গিয়ে সন্ধ্যা হয়ে যেত। ওর মা লাঠি হাতে না দাঁড়ালে বাড়ি ফিরত না। আজ একবছর হল, ছেলেটি আর বাড়ি ফেরে না। মায়ের চোখ আজও প্রতি সন্ধ্যায় মাঠের দিকে তাকিয়ে থাকে। হ্যাঁ, ঘুড়ি আজও ওড়ে, আজও ছেলেরা আনন্দ করে খেলে বেড়ায়, শুধু তার ছেলেটি দেশ ছাড়া। আজও মা রান্না করে ছেলের কথা ভেবে, পুজো করে ছেলের মঙ্গল কামনায়। আর হাজার মাইল দূরে থাকা ছেলেটির জীবন আজ কেটে যাওয়া ঘুড়ির মত। বাঁধনছাড়া। কাজের শেষে ছেলেটি আকাশ দেখে, ভেসে যাওয়া মেঘ দেখে। এই বুঝি বৃষ্টি হবে। ছেলেটি বৃষ্টিতে ভিজে যায়। বৃষ্টির একটি ফোঁটাও জানতে পারে না ছেলেটির মন ভাল নেই।
আসলে যারাই নিজের শহর বা দেশ ছেড়ে কাজের জন্য বাইরে যায়, নিতান্ত বাধ্য হয়েই যায়, জীবনকে আরও একটু ভাল করার জন্য, সমৃদ্ধ করার জন্যই যায়। আর সাথে সাথে একবুক যন্ত্রনা নিয়েও যায়। নিজের গ্রাম, শহর, বন্ধু বান্ধব, পরিবার, পরিজন, বাবা মা স্ত্রী সন্তান ছেড়ে দীর্ঘদিন বাড়ির বাইরে থাকা কতটা কষ্টের, সেটা যারা থাকেন তারাই অনুভব করতে পারেন। তাই যারা নিজেদের পরিবারকে ভাল রাখার জন্য এতটা ত্যাগ স্বিকার করেন, তাদের সকলকে আমার ভালোবাসা। ভাল থাকুক সেইসব ছেলেরা, ভাল থাকুক সেইসব স্বামীরা, ভাল থাকুক বাবারা। নমস্কার।