এই লেখাটি রইলো ....
এভাবে ভাল থাকা যায়?
যে ছেলেটি সদ্য আঠারো বছর পার করেছে, যার দুচোখ জুড়ে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন ছিল, যে গীটার নিয়ে গান গেয়ে কলেজ মাতিয়ে রাখত, যার জীবন বিকশিত হওয়ার আগেই ঝরে গেল, সে কী ভাল থাকতে পারে? যে বাবা মা তাদের অসুস্থ সন্তানকে বাঁচানোর জন্য দিনভোর ঘুরে বেড়ায় এ হাসপাতাল থেকে সে হাসপাতাল, ব্যর্থ হয় প্রতি দরজায়, যে বাবা মা সন্তানের চিকিৎসার জন্য আত্মহত্যার হুমকি দিতে বাধ্য হয়, এত কিছুর পরেও যে বাবা মা তাদের সন্তানকে বাঁচাতে পারেন না, তারা কী ভাল থাকতে পারেন? পারেন না, পৃথিবীর কোনও বাবা মা-ই এভাবে ভাল থাকতে পারেন না। এভাবে ভাল থাকা যায় না।
যে মানুষটি সারাজীবনের প্রবল অধ্যাবসায় আর পরিশ্রমের ভিত্তিতে সাফল্যের চূড়া ছুঁতে চেয়েছিল, যে মানুষটি শত বাধা বিপত্তি সত্বেও তার কর্তব্য ও নিষ্ঠায় অবিচল ছিল, সে যখন তার চার বছরের সন্তানকে একলা করে, সবাইকে নিঃস্ব করে চলে যায়, সে কী ভাল থাকতে পারে? যে শিশুটি জানেই না মৃত্যু কী, যে শিশুটি জানেই না, তার মা আর কখনও ফিরবে না, সে কী ভাল থাকতে পারে। না , পারে না। পৃথিবীর কোনও শিশু এভাবে ভাল থাকতে পারে না। এভাবে ভাল থাকা যায় না।
যে ছেলেটি তার স্ত্রী সন্তানকে কথা দিয়ে গিয়েছিল, এবার তিনমাস পরেই বাড়ি ফিরে আসবে, বলে গিয়েছিল, তোমার জন্য গয়না নিয়ে আসব, বাচ্চাদের বলে গিয়েছিল, তোমাদের জন্য অনেক খেলনা নিয়ে আসব, তোমরা কিন্তু একদম কাঁদবে না। ছেলেটি কথা রাখতে চেয়েছিল, তাই রাজপথ ধরে হাঁটতে শরু করেছিল মাইলের পর মাইল। দিন গিয়ে রাত হয়েছে, রাত গিয়ে দিন হয়েছে, অভুক্ত নিদ্রাহীন শরীরটি কথা রাখতে পারেনি। তার সন্তানেরা পথ চেয়ে ছিল, বাবা খেলনা নিয়ে ফিরবে, না, তার বাবা আর ফেরেনি। আজও শিশুটি পথ চেয়ে থাকে, বাবা কেন ফিরল না। এভাবে কী কোনও বাবা ভাল থাকতে পারে? পারে না, এভাবে ভাল থাকা যায় না।
ছাব্বিশ বছরের যে ছেলেটি, তার পরিবারের একমাত্র উপার্জনশীল, রঙের কাজ নিয়ে গিয়েছিল অন্ধ্রপ্রদেশ। বাড়ির মানুষের হাতে টাকা ছিল না, সে ফিরছিল রেল লাইন ধরেই, তার বন্ধুদের সাথে। ভেবেছিল, সে বাড়ি ফিরলে অন্ততঃ সবাই মিলে ডাল ভাত খেয়ে বাঁচতে পারবে। কখন যে ক্লান্ত শরীরে ঘুমিয়ে পড়েছিল রেল লাইনের উপরেই। না , তার আর বাড়ি ফেরা হয়নি। তার উপার্জনহীন পরিবার, প্রায় অনাহারে বেঁচে আছে। এভাবে কি কে ভাল থাকতে পারে? পৃথিবীর কোনও পরিবার এভাবে ভাল থাকতে পারে না।
বৃদ্ধ পিতামাতার একমাত্র সন্তান যে মেয়েটি সেলাইয়ের কাজ নিয়ে ভিন রাজ্যে গিয়েছিল, আজ চার মাস সে কর্মহীন হয়ে বাড়ি বসে আছে। হাতের জমানো টাকা সব শেষ। সাহায্য আর অনুদান নিয়ে বেঁচে আছে তিনটি প্রাণী। তারা জানেনা, কোন ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে তাদের জন্য। এভাবে কি কেউ ভাল থাকতে পারে?
অসাধারন আবৃত্তি জানা যে ২১ বছরের মেয়েটি সবেমাত্র নার্সিং ট্রনিং শেষ করে কাজে যোগ দিয়েছে, মনপ্রান দিয়ে সেবা করেছে সকলের, কখন যে সে জীবনের কাছে হেরে গেল, জানল না কেউ। শোকে পাথর তার বাবা মা, আজও পথ চেয়ে থাকে, এই বুঝি ফিরে এল। ভাল থাকা? এভাবে? হয় না।
তিন বছরের কন্যা সন্তানকে বাড়িতে রেখে যে পুলিশ অফিসার সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে জনগনকে সামলেছে, ট্রাফিক সামলেছে, হাসপাতাল সামলেছে, কখন যে সে নিজেকে সামলাতে ভুলে গেছে, বুঝতেই পারেনি। শিশুটি আজও অপেক্ষা করে থাকে, এই বুঝি বাবার ফোন এল। আসে না। সে তার বাবার দেওয়া টুপিটি পড়ে আনমনে বলে ওঠে, বাবা, আমিও তোমার মত পুলিশ হবো।
সদ্য ইন্টার্নশিপ পাশ করা যে তরুন ছেলেটি কাজে যোগ দিয়েই ২৪ ঘন্টার ডিউটি পেয়ে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করে, হাসিমুখে গ্রহন করে সমস্ত চ্যালেঞ্জ, সারাদিনের কাজের শেষে ক্লান্ত শরীর জানতে পারে না, সে নিজেই একজন পসিটিভ। তার ভালবাসার মানুষটি অপলক চেয়ে থাকে, ছেলেটির লাস্ট মেসেজের দিকে, চিন্তা করো না, আমি ভাল আছি। এভাবে কেউ ভাল থাকতে পারে? পারেনা।
আসলে বিশ্বজুড়ে আজ যখন অতিমারী, দিকে দিকে শুধু স্বজন হারানোর যন্ত্রনা, কাজ হারিয়ে পরিবার নিয়ে কোটি কোটি মানুষের চরম দুর্দশার সাথে দিন গুজরান, বিশ্বজুরে বেড়ে চলা দারিদ্র্য আর বেকারত্ব, পৃথিবীজুড়ে নানা পেশার মানুষের লড়াই করে মৃত্যুবরণ , অসহায়ের মত মেনে নেওয়া, এভাবে কি কে ভাল থাকতে পারে? সম্ভব না।
সমাজের সকল স্তরের মানুষের জন্য, যারা এই অসম লড়াইয়ের বীর যোদ্ধা, তাদের সকলকে আমার প্রনাম। আমরা আশাবাদী, আজও আশাবাদী, আবার সবকিছু স্বাভাবিক হওয়ার । এক নতুন সকাল দেখার অপেক্ষায় রইলাম। নমস্কার।