সপ্তম বিবাহবার্ষিকী ( ২০২০)
=====================
অসাধারণ সুন্দর ভাবে কাটালাম এবারের বিবাহবার্ষিকী। যেটা সবাই করে, সেটা সাধারন, আর যেটা প্রায় কেউ করে না, করার কথা ভাবেও না, সেটা অসাধারণ। আমারটিও তাই -ই। কেউ কেক, ফুল, মিষ্টি নিয়ে, দুজন দুজনকে গিফট দিয়ে এই দিন পালন করে আবার কেউ বা কোথাও বেড়াতে গিয়ে দিনটি উদযাপন করে। মানে বিশেষ কিছু একটা করে, মনে রাখার মত। আর আমি যেভাবে কাটালাম, তাতে যে কোনও স্বামী, বৌএর হাতে মার খাবে। আমি সব দিনক্ষণ ভুলেই গেছি। মাথায় ছিল ১৪ থেকে ১৭ তারিখ অফিস ছুটি, ১৮ তারিখে অফিস খুলে আবার ৪ দিন ছুটি, সেই ২৩ তারিখ অফিস খুলবে। তাই ১৮ তারিখ অফিস যেতেই হবে, করোনা পরিস্থিতি, অফিসের ইনচার্জ পরিবর্তন, স্টাফের শ্বশুর মশাইয়ের মৃত্যু ও সেই কারনে তার অফিসে না আসতে পারা, সব মিলিয়ে মাথায় শুধু অফিসই চেপে ছিল। এখন স্টাফ মাত্র তিনজন ও এক অফিসার, সেও আবার নতুন, তার সাথে একদিন মাত্র কথা হয়েছে, এবং সে করোনা আক্রান্ত, আসবে কিনা জানা নেই, এমন অবস্থায় মাথায় অফিস ছাড়া কিছুই ছিল না।
তাই কাল মানে মঙ্গলবার রাতে ওকে বলে রাখি, কাল সকালে তাড়াতাড়ি ডেকে দিও, অফিস আছে, দেরি করলে ট্রেন পাবনা। এতদিন না হয় বাইকে গেছি নিজের মত করে, একসময় বেরোলেই হল। ও রাতে বলল,
- কাল অফিস না গেলে হয়না?
- তা কী করে হয়? যেতে হবে।
- আর কেউ নেই?
- আমি ছাড়া কে যাবে? তুমি তো সব জানো।
ও আমার অফিস সংক্রান্ত সব কিছু জানে আর সবাইকে চেনেও, আমার গল্প করার সাথী ও আর মেয়ে। আর ফোনে বাবা, মা। ও আবার বলল,
- সব দায় কী তোমার?
- দায় নয়, যেতে হবে, সবাই নানা অসুবিধার মধ্যে আছে। কাউকে তো সামলাতেই হয়, সে না হয় আমিই গেলাম।
- যাও, কী আর বলব।
ব্যাস, ওর রাগ হয়ে গেল। সব বুঝেও রাগ করবে। আমি চুপ করে ঘুমোনোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু অভ্যাস এমন হয়ে গেছে, ২ টোর আগে ঘুম আসেনা, আর সকাল ১০ টার আগে ঘুম ভাঙে না। এমন না যে জেগে শুয়ে থাকি ইচ্ছে করে, তা কিন্তু নয়। অফিস থাকলে জোর করে উঠতে হয়। যাইহোক, ঘুমোনোর চেষ্টা করলাম। তখন আমার বিন্দুমাত্র মনে নেই, কাল বিবাহবার্ষিকী। ১৮ তারিখ মনে আছে। তার সাথে যুক্ত ঘটনা গুলো মনে নেই।
ও রাতে বসে ভিডিও এডিট করছিল। দুদিন আগে আমার থেকে শিখেছে, নানা জায়গায় আটকে যায়। রাত তখন প্রায় ১ টা। আমি প্রায় ঘুমিয়েছি। ও বলল,
- আমি এটুকু জায়গায় মিউজিক অ্যাড করতে চাই। কেমন করে করব?
ঘুমটা ভেঙে গেল। কোনও রকমে ঘুমের চোখে বলে দিলাম, এই এই কর, হয়ে যাবে। আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। কিছুক্ষণ পরে,
- আমি এইটুকু জায়গায় কথাটা বন্ধ করতে চাই, কিভাবে করব?
আবার গেল ঘুমটা কেটে।
- যেখান থেকে অফ করতে চাও, তার আগে পরে split করে মাঝের audio off করে দাও।
বলে আবার ঘুমিয়ে পড়লাম।
কিছুক্ষণ পরে আবার, পুরো ক্লিপের এইটুকু জুম করতে চাই। দেখো, ঠিক এইটুকু।
এবার গেলাম রেগে, প্রকাশ নেই, বললাম নিয়ে আস দেখি।
- সামনে পেছনে split দাও, মাঝের টুকু select করে pan & zoom এ গিয়ে করে নাও।
বলে আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। এগুলো সব ওকে আগেও দেখিয়েছি, জানি সড়গড় হতে সময় লাগবে। কিন্তু আমার মাথায় ছিল, কাল তাড়াতাড়ি উঠতে হবে। তাই ঘুমিয়ে নিচ্ছিলাম। রাত প্রায় ২ টো তখন,
- Description এ কী লিখব, বলবে?
- হু?
- বলছি, upload হয়ে গেছে, description এ কী লিখব, বলবে?
রাগের না হয় প্রকাশ নেই, কিন্তু কথা বলার ধরন গেছে পালটে, সেভাবেই বললাম,
- ভিডিও তে যা যা আছে, সেগুলোই সংক্ষেপে লিখে দাও। ব্যাস।
এটা একটু জোরে করে বলা হল। আবার ঘুমিয়ে পড়লাম।
কিছুক্ষন পরে,
- ট্যাগ কী দেব, বলবে?
- তুই রাখতো তোর ভিডিও। কাল সকালে করিস। ঘুমোতে দে। আগের গুলো দেখে নে।
এই বলে একেবারে কম্বল চাপা দিলাম।
সকাল ৮ টায় ঘুম থেকে উঠে বাইরে যেতেই ওর মুখোমুখি, ও বলল,
- আমি তোর উপর রাগ করি।
- কেন রে?
- কাল তুই আমার উপর খুব খ্যাট খ্যাট করেছিস।
- কোথায় করলাম, সব তো ভাল করেই বলে দিলাম।
- আমি সব বুঝি।
- বুঝেছিস, ভাল করেছিস, তোকে ফার্স্ট প্রাইজ দেওয়া হবে।
- ইয়ার্কি করবি না একদম।
- জলটল ভরেছ গো।
- সব রেডি আছে, যা।
ওর মুখ ভার। আমার তখনও মনে হয়নি আজ আমাদের বিবাহবার্ষিকী। মনেই নেই।
আমি তাড়াতাড়ি স্নান খাওয়াদাওয়া করে নিলাম আর ও আমার সাথে তাল দিয়ে সব কিছুর যোগান দিতে থাকল, যেমনটি করে আসছে ৭ বছর ধরে। ৯টা ১০ এ ট্রেন, আমি ৯ টা ৪ এ বাইক স্টার্ট দিলাম, আবার টিকিট কাটতে হবে, রোজ যেহেতু অফিস নেই, মান্থলি দরকার হয়না, আবার UTS App ও কাজ করছে না, তাই online এ কাটতে পারছি না। অসুবিধা হল না, কম লোক থাকায় সব ঠিকঠাক হয়ে গেল।
এবারে ট্রেনে উঠে অভ্যাসের কারনে ফেসবুক খুললাম, তিন বছর আগের করা আমার পোস্ট ভেসে এল। তখন বুঝলাম, ওরে বাবা, আজ যে আমাদের বিবাহবার্ষিকী। যাইহোক, ছবিগুলো দেখলাম, খারাপ লাগছিল না।
যথারীতি অফিস করে সন্ধ্যা ৬ টায় বাড়ি ফিরে স্নান করে খেয়েদেয়ে এটা লিখতে বসলাম। তার আগেই দেখেছি, ফেসবুকে ও আমার সেই তিনবছর আগের পোস্ট শেয়ার করেছে। ট্রেনে আসতে আসতে ভাবছিলাম, আজ ও নিশ্চয়ই আমার জন্য বিশেষ কিছু বানিয়ে রাখবে। যেমনটি ওর অভ্যাস আর কি। খেতে বসে দেখি, ওমা, ভাত, পোনা মাছের ঝোল, আলুসিদ্ধ, আর ডিমভাজা। আমি বললাম,
- কীরে বুড়ো, আজ এমন নিরামিষ খাওয়াদাওয়া যে?
- কোথায় নিরামিষ দেখলি?
- এগুলোকে আবার নিরামিষ ছাড়া কী বলব?
- ভাল খেতে খেতে তোর গলা হাই রেঞ্জে চলে গেছে।
- হ, তোরে কইসে।
- তাহলে তুই মাছ, ডিমভাজা কে নিরামিষ দেখিস কোন চোখে?
- এই সব মাছ এখন নিরামিষ বলেই মনে হয়।
- নে, আজ একটু কষ্ট করে খেয়ে নে, কাল ভাল কিছু বানিয়ে দেব। মাংস আনতে গিয়েছিলাম রে, তখন ছিল না।
খেতে খেতেই রাজু দার ( আমার জামাইবাবু) সাথে কথা হয়, ভিডিও কলে। বাবা, মা'র সাথেও কথা হল। ব্যাস দিন শেষ। আর এখন ও বসে বসে ভিডিও এডিট করছে আর আমি লিখছি। মেয়ে ৮ টার সময় ঘুমিয়ে পড়েছে।
এতটা পড়ার জন্য ধন্যবাদ।
শুভরাত্রি।
পুনশ্চঃ - এই লেখাটি upload এর পরে ও পড়ে খুব হাসল পাঁচ মিনিট ধরে, আমিও বিশাল হাসলাম। বলল, কী সব লিখেছিস? আমি বললাম, তোর স্বামী তো শালা ঔপন্যাসিক, তুই জানিস না? তোর স্বামী তো মেলাকিছু।
আবার একপ্রস্ত হাসাহাসি।
No comments:
Post a Comment